উত্তপ্ত সীমান্ত, উদ্বিগ্ন বিশ্ব: প্রেহা ভিহার থেকে তা মুয়েন, কীভাবে শুরু হলো এই সংকট?
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শিরোনামে উঠে এসেছে। এই দুই দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, যার ফলে প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা সংঘর্ষের কারণ, বর্তমান পরিস্থিতি, ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর পেছনের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করব।
সংঘর্ষের কারণ
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত বিরোধের শিকড় রয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে। ১৯০৭ সালে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসনের সময় তৎকালীন সিয়াম (বর্তমান থাইল্যান্ড) এবং ফ্রেঞ্চ ইন্দোচীন (যার মধ্যে কম্বোডিয়া ছিল) একটি চুক্তির মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণ করে। এই চুক্তির মানচিত্র এবং লিখিত বিবরণের মধ্যে অসঙ্গতির কারণে প্রেহা ভিহার মন্দির এবং তা মুয়েন থম মন্দিরের মতো স্থানগুলির মালিকানা নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। ১৯৬২ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) প্রেহা ভিহার মন্দিরের মালিকানা কম্বোডিয়ার পক্ষে রায় দেয়, কিন্তু থাইল্যান্ড এই রায় মানতে অস্বীকার করে। এছাড়া, ২০০৮ সালে কম্বোডিয়ার ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে মন্দিরটির তালিকাভুক্তির প্রচেষ্টা থাইল্যান্ডের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে, যা সংঘর্ষের জন্ম দেয়।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় ২০২৫ সালের মে মাসে, যখন এমারল্ড ট্রায়াঙ্গল নামে পরিচিত ত্রি-সীমান্ত এলাকায় (থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও লাওসের সংযোগস্থল) একজন কম্বোডিয়ান সৈনিক নিহত হয়। এরপর থেকে উভয় দেশই সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি বাড়ায় এবং পারস্পরিক অভিযোগ-প্রত্যাভিযোগে জড়ায়। জুলাই ২০২৫-এ তা মুয়েন থম মন্দিরের কাছে সংঘর্ষ তীব্র হয়, যেখানে থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম গুলি চালানোর অভিযোগ করে, এবং কম্বোডিয়া দাবি করে যে থাই সৈন্যরা মন্দিরের চারপাশে কাঁটাতার বসিয়ে আগ্রাসন শুরু করেছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই সংঘর্ষকে জটিল করেছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতার্ন শিনাওয়াত্রা এবং কম্বোডিয়ার প্রাক্তন নেতা হুন সেনের মধ্যে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংঘর্ষকে উসকে দিয়েছে। হুন সেনের পুত্র হুন মানেত বর্তমানে কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী, এবং তিনি তার পিতার পথ অনুসরণ করে থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। পায়েতংতার্নের সঙ্গে হুন সেনের ফোনালাপের একটি ফাঁস হওয়া রেকর্ডিং থাইল্যান্ডে বিতর্ক সৃষ্টি করে, যার ফলে তাকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করা হয়। এই ঘটনা জাতীয়তাবাদী আবেগকে আরও উসকে দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৫ সালের ২৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ গত এক দশকের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত। থাইল্যান্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, কমপক্ষে ১৯ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। কম্বোডিয়ার পক্ষ থেকে একজন বেসামরিক নাগরিক এবং একজন সৈনিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। উভয় দেশই ভারী অস্ত্র, যেমন আর্টিলারি, রকেট লঞ্চার এবং এমনকি থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে। কম্বোডিয়া থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহারের অভিযোগ করেছে, যদিও থাইল্যান্ড এই অভিযোগ অস্বীকার করেনি।
সংঘর্ষের ফলে থাইল্যান্ডে ১,৩৮,০০০ এবং কম্বোডিয়ায় ৩৫,০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। থাইল্যান্ডের সুরিন প্রদেশে একটি হাসপাতাল এবং একটি পেট্রোল স্টেশন কম্বোডিয়ার গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উভয় দেশই সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। থাইল্যান্ড তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করেছে, এবং কম্বোডিয়াও তাদের দূতাবাসের কর্মীদের ফিরিয়ে নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংঘর্ষ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ২৫ জুলাই একটি জরুরি বৈঠক করে এবং উভয় দেশকে শান্তি ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংঘর্ষ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, যিনি বর্তমানে আসিয়ানের চেয়ারম্যান, একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব দিয়েছেন, যা কম্বোডিয়া গ্রহণ করলেও থাইল্যান্ড তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি
ভারত এই সংঘর্ষের বিষয়ে সতর্ক ও নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, “আমরা থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্তে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছি।” ভারত এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে এবং উভয় দেশকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। ভারতীয় পর্যটকদের জন্য পরামর্শ জারি করা হয়েছে যেন তারা স্থানীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।
ভারতের এই অবস্থান আসিয়ান অঞ্চলের সঙ্গে তার ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন। থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়া উভয়ই ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে, ভারত কোনো পক্ষকে সমর্থন না করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপর জোর দিয়েছে, যা এই অঞ্চলে তার নিরপেক্ষ ভূমিকাকে তুলে ধরে।
সম্ভাব্য প্রভাব ও সমাধান
এই সংঘর্ষের ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে। আসিয়ানের নীতি অনুসারে, সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রত্যাশিত। তবে, থাইল্যান্ডের তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা প্রত্যাখ্যান এবং কম্বোডিয়ার আইসিজে’র কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। চীন, যিনি উভয় দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখে, শান্তির জন্য মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু তার ভূমিকা নিয়ে আঞ্চলিক সন্দেহ রয়েছে।
সমাধানের জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উত্তেজনা হ্রাস করা জরুরি। উভয় দেশকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি রোধে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত সংঘর্ষ ঐতিহাসিক বিরোধ, জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং রাজনৈতিক গতিশীলতার একটি জটিল মিশ্রণ। এই সংঘাত শুধুমাত্র দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধের প্রতিফলন নয়, বরং এটি আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের নিরপেক্ষ অবস্থান এবং শান্তির আহ্বান এই অঞ্চলে তার কূটনৈতিক পরিপক্বতা প্রদর্শন করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনে, এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব, তবে তার জন্য উভয় দেশের নেতৃত্বের সদিচ্ছা অপরিহার্য।


https://tinyurl.com/26m95ker